শহীদ বেলাল : স্মৃতির অলিন্দে অম্লান একটি নাম
মাহমুদুর রহমান দিলওয়ার : আল্লাহ তায়ালার অমিয় বাণী: ‘প্রত্যেক আত্মাকেই মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করতে হবে।’ পৃথিবীর জীবন ক্ষণস্থায়ী আর মৃত্যু এক অনিবার্য বাস্তবতা। মৃত্যুর পরবর্তী অবস্থা নিয়ে মতভেদ আছে, কিন্তু একদিন সবাইকে মরতে হবে-সে বিষয়ে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে কোন মতপার্থক্য নেই। ‘মৃত্যু’ পৃথিবীর মায়ামোহ, ধন-দৌলত থেকে সবাইকে বিচ্ছিন্ন করে। ভাই-বোন, পিতা-মাতা কিংবা বন্ধু-বান্ধব আর আত্মীয়-স্বজনের সম্পর্কের মাঝে ফারাক তৈরি করে। প্রেম-ভালোবাসার বন্ধনকে ছিন্ন করে। এমনকি এক পর্যায়ে মৃত ব্যক্তিকে তাদের স্বজন কিংবা পরিচিত জনের হৃদয় থেকে ভুলিয়ে দেয়। কিন্তু মৃতকে বাঁচিয়ে রাখে একটি মৃত্যু। সেই মৃত্যু সৌভাগ্যের, সেই মৃত্যু শাহাদাতের। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়, তাদরেকে মৃত বলো না। এসব লোক প্রকৃতপক্ষে জীবিত, কিন্তু তোমরা তা উপলব্ধি করতে পার না।’ কবির ভাষায়: ‘জীবনের চেয়ে দৃপ্ত মৃত্যু তখনি জানি/শহীদী রক্তে হেসে উঠে যবে যিন্দেগানী’।
হযরত শাহজালাল (রহ.) সহ ৩৬০ আউলিয়ার স্মৃতিধন্য পূণ্যভূমি সিলেট। সিলেটকে বলা হয়ে থাকে এ দেশের আধ্যাত্মিক রাজধানী। ১৯৯১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি ইসলামের মহান অনুসারী হযরত শাহজালাল (রহ.) এর নামানুসারে জাতিকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমনস্ক উন্নত ও আদর্শ নাগরিক উপহার দেয়ার মহান ব্রত নিয়ে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়।
সিলেটে এই বিদ্যাপীঠ প্রতিষ্ঠার পেছনে রয়েছে আবেগ, অনুভূতি আর এক সুদীর্ঘ ইতিহাস। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্বাবদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অসংখ্য অগণিত বিদ্যাপীঠ নিজ নিজ এলাকার নামে প্রতিষ্ঠিত। অথচ সিলেট বিশ্ববিদ্যালয় না হয়ে আমাদের এই বিদ্যাপীঠের নাম ‘শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়’, যা এলাকার ঐতিহ্য আর অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ মাত্র।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠালগ্নে সবার প্রত্যাশা ছিলো শাহজালালের স্মৃতিধন্য এ ক্যাম্পাস থেকে ইবনে সিনা, আল-ফারাবি, ইমাম গাজ্জালী, ইবনে রুশদ, আলকেমি আর ইবনে খালদুনের মতো মুসলিম বিজ্ঞানী ও গবেষক তৈরি হবে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে আমাদের প্রাণপ্রিয় এই বিশ্ববিদ্যালয় একটি কুচক্রী মহলের ষড়যন্ত্রের নির্মম শিকারে পরিণত হচ্ছে।
৩০ আগস্ট ১৯৯৯ সাল। শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮৭তম সিন্ডিকেট সভার আয়োজন করা হয়। সিন্ডিকেট সভায় কিছু বিতর্কিত প্রস্তাবনা পাস হয়। সিলেটবাসী তথা দেশবাসীর আশা-আকাঙক্ষা, আবেগ-অনুভূতি, ইতিহাস-ঐতিহ্য ভুলুণ্ঠিত হওয়ার মতো সিদ্ধান্ত নিতে সিন্ডিকেট সদস্যরা কার্পণ্য করেননি। শাহজালাল (রহ.) এর নামে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল ও ভবনের নামকরণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় কিছু সংখ্যক নাস্তিক-মুরতাদ আর ঘৃণিত ব্যক্তিবর্গের নামে। যে খবর ৩০ সেপ্টেম্বর ‘৯৯ তারিখের একটি দৈনিকে ছাপা হয়।শুরু হয় প্রতিবাদ, প্রতিরোধ আর দুর্বার আন্দোলন। কেননা এরকম হঠকারী ও ন্যাক্কারজনক সিদ্ধান্ত মেনে নেয়া যায় না। বিবৃতি, স্মারকলিপি, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, মতবিনিময় সভা, প্রতিবাদ সমাবেশ ও মিছিল শুরু হয়। এক পর্যায়ে হরতাল আর গণমিছিলের মাধ্যমে শুরু হয় গণআন্দোলন। ছোট-বড় সকল সামাজিক ও রাজনৈতিক দলগুলো ঐক্যবদ্ধ হতে লাগলো। ওলি-আউলিয়া বিরোধী তথা ইসলামের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া সরকার ও কুচক্রী মহলের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে আসে আপামর তৌহিদী জনতা।
এই আন্দোলন ছিলো সত্য-ন্যায়, কল্যাণ-সুন্দর ও ইসলামের পক্ষে। এ আন্দোলন ছিলো অন্যায়, জুলুম ও বাতিল শক্তির প্রতিরোধে। আন্দোলন সফল করতে গিয়ে জেল-জুলুম, নির্যাতন-নিপীড়ন, বাধা-প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করতে হয়েছে। এমনকি ঝরে পড়েছে সুশোভিত বাগানের একটি সুগন্ধময় গোলাপ। সেই সুঘ্রাণ ছড়ানো গোলাপ আর কেউ নন, আমাদের প্রিয় ভাই শহীদ আব্দুল মুনিম বেলাল। যার শাহাদাত ঐ আন্দোলনকে সফল করেছিলো। যার জীবন বিসর্জন থেকে শুধু সিলেটবাসী নয়, গোটা দেশের তৌহিদী জনতা ব্যথিত ও অনুপ্রাণিত হয়েছিলো। ২৫ ডিসেম্বর ‘৯৯। বিতর্কিত নামকরণবিরোধী আন্দোলনের কর্মসূচি সফল করতে (মাহে রমজানে) রোজাদার অবস্থায় তৎকালীন সরকারের প্রভাবশালী এক মন্ত্রীর নির্দেশে বিডিআর’র বুলেটের আঘাতে শাহাদাত বরণ করেন শিবিরকর্মী শহীদ বেলাল।
২৬ ডিসেম্বর ঐতিহাসিক কোর্ট পয়েন্টে শহীদ বেলালের জানাজায় হাজার হাজার শোকার্ত মানুষের ঢল নামে। কোর্ট পয়েন্ট এক জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছিলো। কোর্ট পয়েন্টের জানাজার পর তৌহিদী জনতা রওনা হয় তার বাড়ির পথে। সে এক বিরল দৃশ্য! তার প্রতি মানুষের ভালোবাসা কতটুকু ছিলো, সেদিন তা দেখা গেলো। শহীদের কফিন নিয়ে দলমত নির্বিশেষে আপামর জনতা তার বাড়ির পথে পায়ে হেঁটে অগ্রসর হলো। কিশোর তরুণরা শুধু নয়, পায়ে হেঁটে রওনা হন ৬০/৭০ বছরের বৃদ্ধ লোকও। ধীরে ধীরে দক্ষিণ সুরমার বরইকান্দি, তেলিরাই, গোপশহর, মন্দিরখলা, খালপাড়, মোল্লারগাঁও, সদরখলা, খানুয়া, ইনাতাবাদ গ্রাম হয়ে প্রায় ৮ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে তার গ্রামের বাড়ি মেদেনীমহল (পাইকেরগাঁও) পৌঁছল তাকে বহনকারী জনতা। সে দৃশ্য আজো ভুলতে পারিনি। তার প্রতি আপামর জনতার সেই ভালোবাসা আজো আমাদের প্রেরণা জোগায়।
পিতা আব্দুল মালিক আর মাতা হালিমা খাতুনের বুকের ধন শহীদ আব্দুল মুনিম বেলাল। ৫ বোন ও ২ ভাইয়ের মধ্যে তিনি চতুর্থ ছিলেন। তিনি ছিলেন তার পরিবারের সবচেয়ে প্রিয় সন্তান। জনাব আব্দুল মালিক তার প্রিয় সন্তানকে ইসলামের বাস্তব অনুসারী ও আলেমে দ্বীন হিসেবে গড়ে তোলার জন্য তাকে ভর্তি করেছিলেন ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি বিদ্যাপীঠ শাহজালাল জামেয়া ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসায়। সেই মাদ্রাসায় আলিম পরীক্ষার্থী থাকাকালীন সময়ে তিনি শাহাদাত বরণ করেন। তিনি তার পরিবারের সদস্যদের ইসলামের পথে পরিচালিত করার লক্ষ্যে সদা তৎপর ছিলেন। শাহাদাতের পূর্বে রমজান মাসের শুরু থেকেই নিজ বাড়িতে মহিলাদের তারাবিহ নামাজ আদায়ের সুযোগ তৈরি করে দেয়াই তার সেই আন্তরিক প্রচেষ্টার বাস্তব প্রমাণ।
শহীদ বেলালের কফিন বাড়িতে পৌঁছামাত্র এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়েছিলো। প্রিয় মা, ভাই-বোন আর আত্মীয়-স্বজনের আহাজারিতে এক বেদনাময় অবস্থার সৃষ্টি হয়। প্রথম শাহাদাত বার্ষিকী উপলক্ষে আমরা তার বাড়িতে গিয়েছিলাম। কবর জিয়ারত সম্পন্ন করে শহীদের মায়ের সাথে সাক্ষাৎ করেছিলাম। প্রিয় মাকে সান্তনা দেয়ার কোন ভাষা আমাদের কাছে ছিল না। তিনি আমাদের উদ্দেশে বলেন, ‘তোমরা আমার সন্তানের মতো। তোমাদের দেখে বেলালের কথা বারবার মনে পড়ছে। বেলাল আমার পাশে নেই, ভাবলে মনকে সি’র রাখত পারি না। আবার যখন ভাবি আমার প্রিয় সন্তান শহীদ হয়েছে, তখন মনটা প্রশান্তিতে ভরে ওঠে। আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করি একজন শহীদের জননী হিসেবে।’
শহীদের একমাত্র বড় ভাই আব্দুল মুহিত দুলাল ভাইয়ের সাথে দেখা হলেই তিনি আমাদের আদর করে বুকে জড়িয়ে ধরেন। ইসলামী আন্দোলনের প্রতিটি কর্মীর মাঝে তিনি শহীদ বেলালকে খুঁজে পাওয়ার আনন্দ অনুভব করেন। তার কথাবার্তা আর অমায়িক ব্যবহার আমাদেরকে উদ্দীপ্ত করে।ক’দিন আগে শহীদের গর্বিত পিতার সাথে দেখা করতে গেলাম। শ্রদ্ধেয় পিতার কন্ঠে শহীদের স্মৃতি জানতে আগ্রহ প্রকাশ করলাম। তিনি কিছু স্মৃতিচারণ করলেন। তিনি বললেন, শহীদ বেলাল বড়দের শ্রদ্ধা করতো, ছোটদের খুব স্নেহ করতো। সে শাহাদাত বরণ করার পর এলাকার সকল মুরব্বীরা একত্রিত হয়ে চোখের পানি ফেলে তার শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শনের স্মৃতিচারণ করেন। তাদের মতে, বেলালের মতো ভদ্র ও মার্জিত আচরণের তরুণ পাওয়া অনেক কঠিন। তার অমায়িক ব্যবহার সবাইকে মুগ্ধ করতো। শহীদের পিতা বলেন, সে এলাকার সমস্যা-সম্ভাবনা নিয়ে চিন্তা করতো। সমাজের দারিদ্র মানুষের সহায়তায় সে একটি সমিতি গড়ে তুলেছিল। তিনি স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, শহীদ বেলাল কোরআন-হাদীসের বাস্তব অনুসারী ছিল। পরিবারের সকল সদস্যদেরকেও সেই পথে চলতে সহায়তা করতো।শহীদ বেলাল এক প্রেরণার নাম। যার জীবন ছিলো ঈমানী নূরের আলোকচ্ছটায় উদ্ভাসিত। তার চলাফেরা ও কথাবার্তা ছিলো অনুসরণীয়। তিনি ছিলেন নিরহঙ্কারী ও সদালাপী। অন্যায়কে তিনি প্রচণ্ড ঘৃণা করতেন। আলিম প্রথম বর্ষে পড়াকালীন সময়ের একটি ঘটনা তার বাস্তব প্রমাণ। ক্লাস ক্যাপ্টেনসহ কয়েকজন সহপাঠী একটি অন্যায় সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলো। সে বিষয়ে তারা সকল ছাত্রের সাপোর্ট আদায়ের জন্য জোর দাবি উত্থাপন করলো। এমনকি তারা তাদের বিপরীতে অবস্থান না করার হুমকি পর্যন্ত দিয়েছিলো। কেউ প্রতিবাদ করছে না দেখে শহীদ বেলাল ভাই একাই দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করলেন। অন্যায় সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করলেন। হুমকি ধমকিকে তুচ্ছজ্ঞান করে উড়িয়ে দিলেন। তার সততা আর সাহসিকতায় সহপাঠীরা সেদিন লজ্জা পেয়েছিলো, অনুতপ্ত হয়েছিলো। শহীদ বেলালের অনেক স্মৃতি আমাদের চলার পথে প্রেরণা জোগায়।














February 28th, 2012 at 1:29 am
Hot damn, looking pertty useful buddy.