জীবনযুদ্ধে নিরন্তর এক বীর যোদ্ধার নাম আমির আলি
আব্দুস সামাদ, সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : মুক্তির স্বপ্ন ছিলো তার অন্তর জুড়ে। দেশ মাতৃকাকে পরাধীনতার শৃঙ্খল মুক্ত করতে তিনি ছিলেন অদম্য। গরীব ঘরের ছেলে তিনি। দেশের জন্য তার ভালোবাসা অপরিসীম। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ তাকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্বেলিত করে। দেশের জন্য সেবা দেয়ার এক মহান অভিব্যক্তি ছড়িয়ে পড়ে তার চোখে-মুখে। যোগ দেন তিনি একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে। জান বাজি রেখে লড়াই করেন দেশের স্বাধীনতার জন্য। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের বিজয়ী সেই সেনানীর নাম মো: আমির আলি গাজী(৫৮)। যুদ্ধজয়ী এই যোদ্ধা এখন জীবনযুদ্ধে হেরে চলেছেন অবিরত। কলারোয়া উপজেলা সদর থেকে ১২ কিলোমিটার দূরের কপোতাক্ষ লাগোয়া গ্রাম দলুইপুর। এই গ্রামের মরহুম রহিম বক্স গাজীর ছেলে তিনি। একাত্তরের এই বীরযোদ্ধার আজ বেঁচে থাকার সংগ্রাম। শারীরিক ব্যাধি সারাবার ব্যয়ভার বহনের ক্ষমতা আজ তার নেই। যে মানুষের এক সময়ে ছিলো তেজোদ্দীপ্ত শরীরীভাষা। আজ সে মানুষের চোখেমুখে উদ্বেগ-অপ্রাপ্তির ছায়া। সময়ের ব্যবধানে আজ কেবলই রোগ-ব্যাধি নিরাময় ও দারিদ্রভরা সংসার নির্বাহের চিন্তায় কেটে যায় এই বীর মুক্তিযোদ্ধার এক একটি দিন। গত ৬ ডিসেম্বর কলারোয়া মুক্ত দিবসে একটি চায়ের দোকানে বসে এ প্রতিবেদকের কথা হয় মুক্তিযোদ্ধা আমির আলির সাথে। কথা বলে জানা গেলো তাঁর একাত্তরের বীরত্বগাঁথার কথা ও আজকের নানা অপ্রাপ্তি-বঞ্চনার কথা। আমির আলি বলেন, দেশ স্বাধীনের স্বপ্ন ও বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণে অনুপ্রাণিত হয়ে আমি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিই। ৮ নং সেক্টরের অধীনে বিহারের চাকুলিয়ায় গেরিলা ট্রেনিং করেন ৪ সপ্তাহ। তার অবসস্থান ছিলো সে সময় ভারতের ঘোজাডাঙ্গা ক্যাম্প। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন কাকডাঙ্গা ও বালিয়াডাঙ্গার সম্মুখ যুদ্ধে তিনি সরাসরি অংশগ্রহণ করেন। খোরদো-ত্রিমোহিনী যুদ্ধে তিনি অংশ নেন। তার সংগ্রামী জীবনের প্রতিটি অপারেশনে তিনি সফলতা পান। মুক্ত করে ফেলেন কলারোয়ার একেকটি অঞ্চল। বিজয়ীর বেশে নিজ এলাকায় ফিরে ওড়ান স্বাধীন দেশের পতাকা। গরীব ঘরের এই যোদ্ধা ভেবেছিলেন স্বাধীন দেশে একটা রুটি-রুজির ব্যবস্থা হয়ে যাবে। তার ৩ শতক মাত্র ভিটেবাড়ি। এছাড়া তার আর কোনো জমিজমা নেই। সংসারে তার স্ত্রী, ৩ ছেলে ও ৪ মেয়ে। বড় সংসারের ব্যয়ভার মেটাতে আশির দশকে তিনি বাইসাইকেলে কেরিয়ারে সিট বানিয়ে যাত্রী বহন করতে থাকেন। ওই বাহনকে সে সময় বলা হতো ‘হেলিকপ্টার’ বাইসাইকেল। তাতে অতি কষ্টে চলতো তার সংসার। এভাবে বেঁচে থাকার লড়াই তাকে করতে হয় প্রতিদিন। এভাবেই যখন চলছিলো দু:খেভরা একেকটি দিন, ঠিক তখনই ১৯৯৯ সালে একদিন উঁচু খেজুরগাছ থেকে তিনি দড়ি ছিঁড়ে পড়ে যান মাটিতে। প্রচন্ড আঘাতে মের”দন্ডে বড় ধরণের ফ্রাকচার হয়। তাকে ভর্তি হতে হয় কলকাতার নীলরতন হাসপাতালের অর্থোপেডিক বিভাগে। সেখানে অস্ত্রোপচারের পর সুস্থ হয়ে তিনি বাড়ি ফেরেন ঠিকই। কিন্তু হারিয়ে ফেলেন শারীরিক শক্তির অনেকটুকুই। আর ভিন দেশের এই ব্যয়বহুল চিকিৎসা সেবা নিতে দেনায় তিনি ডুবে যান। গত ১১ বছর ধরে প্রতি বছর চেকআপের জন্য তাকে একবার ওই হাসপাতালে যেতে হয়। প্রতি চেকআপে ভারতীয় ১ হাজার ৭ শ’ রূপি খরচ পড়ে। যা এই দৈন্যভরা জীবনে তার জন্য রীতিমতো দু:সাধ্য। আর একটু সুস’ভাবে বেঁচে থাকার জন্য তার এই রুটিন চেকআপ’র কোন বিকল্প নেই। অর্থের অভাব এতটাই প্রকট আকার ধারণ করেছে যে মুক্তিযোদ্ধা আমির আলির পক্ষে চিকিৎসা ও সংসার একসাথে চালিয়ে যাওয়া ভীষণ কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই সরকারী-বেসরকারী বা ব্যক্তি উদ্যোগের সহায়তা আজ ভীষণ প্রয়োজন হয়ে পড়েছে এই বীর যোদ্ধার। আমির আলি জানান, তিনি বর্তমানে প্রতি মাসে ২ হাজার টাকা সরকারীভাবে ভাতা পাচ্ছেন। এছাড়া তার আর কোনো অর্থ প্রাপ্তির সুযোগ নেই। এই সীমিত অর্থে কীভাবে তিনি চিকিৎসার ধারাবাহিক খরচ চালাবেন বা কীভাবে সংসার নির্বাহ করবেন- এই চিন্তায় কাটে তার দিন-রাত। ছেলে-মেয়েদের কথা জিজ্ঞেস করতে তিনি বললেন, বড় ছেলে ফারুক(৩৮) ও মেজ ছেলে হারুন(২৫) অপরের জমিতে কৃষি কাজ করে। ছোট ছেলে সোহান(১৮) যশোর এমএম কলেজে প্রথম বর্ষে অনার্স পড়ে। তার ৪ মেয়ে পারুল, ফিরোজা, শাবানা ও ফেরদৌসি-এদের সকলেরই বিয়ে হয়ে গেছে। তিনি বলেন, তার এই চিকিৎসার জন্য এ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে সহায়তা করেছেন এমআর ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা মিজানুর রহমান, দেয়াড়ার প্রয়াত ইউপি চেয়ারম্যান সম আনোয়ারুল ইসলাম, সাতক্ষীরা জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ও উপজেলা সমাজসেবা অধিদপ্তর। মুক্তিযোদ্ধা আমির আলি বলেন, সরকারী ভাতার পরিমাণ সামনে আরও কিছু বাড়বে বলে জানা গেছে। তারপরও চিকিৎসার এই নিয়মিত খরচ ও সংসারের খরচ এই দুটো একসাথে সামলানো তার জন্য দুরূহ হয়ে পড়েছে। একাত্তরের রণাঙ্গণে হার না মানা এই যোদ্ধা স্বাধীন দেশে জীবনের প্রতিটি পদে পদে হার মানতে বসেছেন। তার এই জীর্ণ দশার জীবনধারা একটু টেকসই করতে দেশপ্রেমিক সকল নাগরিকের সহযোগিতা কামনা করেছেন আমির আলি।











