,

প্রভা রানী বীরাঙ্গনা স্বীকৃতির জন্য আর কতকাল অপেক্ষা করতে হবে?

প্রভা রানীবিশ্বজিৎ রায়, কমলগঞ্জ(মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি : মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার মির্জানগর গ্রামের বাসিন্দা এক ভাগ্যাহত মহিলা বীরাঙ্গনা  প্রভা রানী মালাকার। ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন সময়ে যার সম্ভ্রমের বিনিময়ে  পাক সেনা ও তাদের দোসর রাজাকারদের কবল থেকে  রক্ষা পেয়েছিল মীর্জানগর গ্রামের অনেক অসহায় মানুষ প্রাণ। স্বাধীনতার দীর্ঘ ৩৯ পেরিয়ে গেলেও  মহিয়শী নারীর ভাগ্যে জুটেনি সরকারী স্বীকৃতিটুকু। ত্যাগী এই নারী যেখানে সকলের সন্মানের পাত্র হওয়ার কথা সেখানে তার ভাগ্যে জুটেছে নানা লাঞ্চনা আর গঞ্জনা। তাকে ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করা হয় পাঞ্জাবীর বউ বলে।১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পাক হানাদারদের স্থানীয় দোশর  রাজাকাররা ধরে নিয়ে  তুলে দিয়েছিল পাক সেনাদের হাতে। সে সময়ের ১৫ বছরের প্রভা রানী বিক্রম কলস গ্রামে ও শমশেরনগর ডাক বাংলোয় পাক সেনা ক্যাম্পে দু’বার গণ ধর্ষনের শিকার হতে হয়েছিলেন। সেদিন তার সম্ভ্রমের বিনিময়ে যে মির্জানগর গ্রামের অসহায় মানুষগুলোর প্রাণ রক্ষা পেয়েছিল হানাদারদের কবল থেকে সেই গ্রামের লোকজনই তাকে কটাক্ষ করে । একমাত্র আধা পাগল ছেলেটাও বাদ পড়েনি পাঞ্জাবীর জারজ সন্তানের অপবাদ থেকে। এর চেয়ে বড় দূর্ভাগ্য আর কি হতে পারে। কিন্তু স্বাধীনতা লাভের ৩৯ বছর অতিবাহিত হলেও সেই হতভাগ্য মহিলার ভাগ্যে জুটেনি বীরাঙ্গনার স্বীকৃতি। পাননি কোন সরকারী সাহায্য সহযোগীতা।কেউ কোন দিন খোঁজ করেননি কেমন আছেন স্বামী হারা প্রভা রানী মালাকার। দু’বেলা দু’মুটো ভাতের জন্য গ্রামে গ্রামে ফেরী(হকারী) করে যে আয় রোজগার করেন তা দিয়ে কোন রকমে ছেলে, ছেলের স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে বেঁচে আছেন। স্থানীয় ভূমিখেকোদের করাল গ্রাসে দখল হয়ে যাচ্ছে স্বামীর রেখে যাওয়া শেষ ভিটে-মাটিটুকুও। গত ২৯শে মে তার নিজ বাড়ীতে বসে ৭১-এর বীরঙ্গনা এই মহিযশী নারী জানালেন তার জীবনের এই নির্মম ও করুন কাহিনী। বিয়ের ৩ মাসের মাথায় মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে স্বামী কামিনী রাম মালাকার মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে ট্রেনিং নিতে ভারতে পাড়ি জমান। প্রভা রানী নিরাপত্তাহীনতার কারণে মির্জাপুর থেকে তার বাবার বাড়ী পাশ্ববর্তী গ্রাম বিক্রমকলসে চলে যান । সেখানে অবস্থানকালীন সময়ে একদিন গোধুলী লগ্নে বিক্রম কলস গ্রামের রাজাকার নজির মিয়া ও জহুর মিয়া প্রভা রাণীকে তার মায়ের সামন থেকে জোর পূর্বক তুলে নিয়ে যায় পাশ্ববর্তী বাদল মাষ্টারের বাড়ী। সেখানে অবস্থানকারী  পাকিস্তানী সেনা বাহিনীর সদস্যরা সে রাতেই অস্ত্রের মুখে জোর পূর্বক কেড়ে নেয় তার সম্ভ্রম। পরদিন সকালে আর্মিরা তাকে ছেড়ে দিলে তিনি আশ্রয় নেন তার বোনের বাড়ী জাঙ্গাল হাটি গ্রামে। সেখানে  আত্মগোপন করে থেকেও দ্বিতীয় দফা নির্যাতনের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা পাননি তিনি ।  ঘটনার  ২০/২৫ দিন পর রাজাকার কাদির, রইছ , ইনতাজ ও তাদের সহযোগীরা জাঙ্গাল হাটি প্রভা রানীর বোনের বাড়ীতেও হানা দেয়। নিজেকে রক্ষার জন্য ধানের বীজ তলার আইলের নীচে আশ্রয় নিয়েও শেষ রক্ষা হয়নি। হায়েনারা সেখান থেকে তাকে জোর করে ধরে নিয়ে আসে। এ সময় স্থানীয় গফুর মিয়া তাকে বাঁচাতে এগিয়ে আসায় তিনিও তাদের হাতে লাঞ্চিত হন। রাজাকাররা প্রভা রাণীকে ধরে নিয়ে আসার সময় তাদের পালিত কুকুর তার কাপড় ধরে টানতে থাকে। সোনারার দিঘির পার পর্যন্ত কুকুরটি আসার পর সেটিকে গুলি করে মেরে ফেলা হয়। শমশেরনগর ডাক বাংলোর সেনা ক্যাম্পে আটকে রেখে সারা রাতভর তার উপর পালাক্রমে চালানো হয়  পাশবিক নির্যাতন। পাক সেনাদের কাছে অনেক কাকুতি-মিনতি করে  নিজেকে বাঁচানোর সকল চেষ্টা করেও কিন্তু কোন লাভ হয়নি। এক সময় জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন প্রভা রানী। ভোর রাতে জ্ঞান ফেরার পর তিনি সুযোগ বুঝে এক সময় পাক সেনাদের ক্যাম্প থেকে পালিয়ে আসেন। দেশ স্বাধীনের স্বামী বাড়ী ফিরে এসে সমূহ ঘটনা জেনেও হাসিমুখে তাকে ঘরে তুলে নেন। তিনি প্রভাকে সান্তনা দেন “তোমার মতো লাখ লাখ নারী ইজ্জত দিয়েছে দেশের জন্য। আমার কোন দুঃখ নেই”। স্বাধীনতা লাভের এক বছর পর ১৯৭২ সালে তার গর্ভে জন্ম নেয়া মানসিক ভারসাম্যহীন একমাত্র ছেলে কাজল মালাকারই রিক্সা চালিয়ে তার ভরন পোষন চালাচ্ছে। আক্ষেপ করে প্রভা রানী বলেন, এলাকার মানুষের নিকট মুখ দেখানো যায় না। তিনি ও তার ছেলেকে বাড়ির আশ পাশের নিজ ধর্ম ও বর্ণের লোকজনসহ মানুষজন  পাঞ্জাবীর বউ ও জারজ সন্তান সহ নানা অশালীন কটুক্তি করে। গ্রামের সহজ-সরল মহিলা প্রভা রানী জানেনই না  মুক্তিযুদ্ধের সময় যে নারীরা সম্ভ্রম হারিয়েছেন স্বাধীনতা পরবর্তী সরকার তাদের বীরাঙ্গনা উপাধি দিয়েছেন। তাই তিনি কোথাও কোন সময় প্রকাশ করেননি নিজের অবস্থানের কথা। আজও  বীরাঙ্গনা খেতাব পাওয়ার জন্য আবেদন করেননি প্রভা রানী। দেশ স্বাধীন হবার পর বিভিন্ন সংস্থার লোকজন তার নিকট থেকে তাকে নির্যাতন করার কাহিনী সংগ্রহ করেছেন। কিন্তু প্রভা রানী কোন সংস্থার লোকের নিকট তার কথা বলেছেন তা বলতে পারেননি। সে সময় তার ইজ্জত লুন্টন করা দলের  নজির, ইন্তাজ, ইদ্রিছ, রইছ পরবর্তীতে কারভোগ করেছিল। কারাগার থেকে বের হয়ে কমলগঞ্জ উপজেলার শমশেরনগরের মৃত ইদ্রিছ মিয়া প্রভা রানীর স্বামীর উপর মিথ্যা মামলা দিয়ে তার স্বামীকে কারাগারে প্রেরণ করেছিল। কয়েক বছর পর প্রভা রানীর স্বামী মারা যায়। স্বামী মারা যাওয়ার পর দু’বেলা দুমুটো ভাত খাওয়ার জন্য প্রভা রাণী বেছে নেন ফ্যারি করার কাজ। নিজের মাথার উপর টুকরি(ঝাঁপি) রেখে গ্রামে গ্রামে তিনি বিক্রি করছেন বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রী। এক সময় তার ছেলে কাজল মালাকার বিয়ে করে। বর্তমানে তার ৬ মেয়ে। ৯ সদস্য বিশিষ্ট পরিবারে একবার খেলে আরেকবার না খেয়ে থাকতে হয় তাদের। পাশাপাশি বসত বাড়ীর জায়গা জমি নিয়ে মানিক মালাকার, করুন মালাকার, কৃপেশ মালাকার ও নিতাই মালাকারের সাথে চলছে দ্বন্দ্ব। টাকা পয়সা না থাকায় ন্যায় বিচার পাওয়া নিয়ে শংকা প্রকাশ করেছেন স্বাধীনতা যুদ্ধে সম্ভ্রম হারানো এই মহিলা। জাতীর কাছে তার একটাই প্রশ্ন, এভাবে লাঞ্চনা গঞ্জনা সহ্য করে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির জন্য তাকে আর কতকাল অপেক্ষা করতে হবে ? স্থানীয় সাংবাদিকদের কাছ থেকে প্রভা রানীর কথা শুনে এ দিন বেলা ২ টায় খাদ্য সামগ্রী ও কাপড় চোপড় নিয়ে তার বাড়িতে এগিয়ে এলেন কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রকাশ কান্তি চৌধুরী। সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে তিান কিছুটা সাহায্যেরও ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। এ বিষয়টি তিনি সংশ্লিষ্ট উর্দ্ধতন মহলে অবহিত করবেন বলেও জানান।খাদ্য সামগ্রী ও কাপড় চোপড় নিয়ে তার বাড়িতে এগিয়ে এলেন কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রকাশ কান্তি চৌধুরী।

পাঠকের মন্তব্যঃ

  1. aunjan  বলেছেন:

    how can people so cruel like this ???????????

  2. সদেরা সুজন  বলেছেন:

    মা-গোআমরা তোমার কাছে ঋণি, তাবত বাংলাদেশ তোমার কাছে ঋণি, যা শোধ হবার নয়। এদেশের বেঈমান বিশ্বাসঘাতক রাজাকার আলবদর আলসামস কিংবা পতিতা রাজনীতিকদের দিন বদল হয় রাতারাতি লোটেফোটে খায় চোখের পলকে আঙ্গুল ফুল কলাগাছ হয়। টাকার জাহাজ নিয়ে তাবত দেশটাই খেতে চায় অথচো তোমাদের দিন বদল হয় না। এ কষ্ট শুধু তোমার নয় গো মা, স্বাধীনতা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অনেকেরই। স্বাধীনতার পক্ষের দাবিদার সংগঠন আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় থাকলেও তোমাদের দিন বদলেনা, কিন্তু তাদের দিন বড় রাতারাতি করে বদলে যায়।শতকোটি টাকা খরচ করে আনন্দ উতসব করে আর তোমরা বাংলাদেশের জননীরা না খেয়ে মরছো…..! এসব বর্রতা, জঘন্যতা দেখে কষ্টে কষ্টে ঘৃণা জানানোর ভাষা এখণ হারিয়ে ফেলছি। কি করে গর্ব করে বলবো আমরা স্বাধীনতা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষ…..


(আপনার মোবাইল নম্বরটি অপ্রকাশিত থাকবে)


(আপনার ইমেইল এ্যাড্রেসটি গোপন রাখা হবে)


(বাংলায় মন্তব্য লিখতে ইউনিকোড বাংলা সফ্‌টওয়্যার ব্যবহার করুন)

পাতার শুরুতে