,

বীরাঙ্গনা আরিনাঃস্বাধীনতার ৪০ বছরেও যার ভাগ্যে জোটেনি সরকারী স্বীকৃতি

বীরাঙ্গনা আরিনাঃস্বাধীনতার ৪০ বছরেও যার ভাগ্যে জোটেনি সরকারী স্বীকৃতিবিশ্বজিৎ রায়, মৌলভীবাজার প্রতিনিধিঃ ৭১ এর মহান মুক্তি সংগ্রামে কমলগঞ্জ উপজেলার সাহসী সনন্তানরা যেমন গৌরবোজ্জল ভূমিকা রেখেছিলেন তেমনি পাকবাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের হাতে সম্ভ্রম হারিয়েছেন ,জীবন দিয়েছেন এ উপজেলার অনেকেই। মোছাঃ আরিনা বেগম এদেরই একজন। স্বাধীনতাযুদ্ধের বলী এই বীরাঙ্গনা মহিলা আজও বেচেঁ আছেন ইতিহাসের নির্মম স্বাক্ষী হয়ে।
কমলগঞ্জ উপজেলার রহিমপুর ইউনিয়নের বড়চেগ গ্রামের আওয়ামীলীগের একনিষ্ট কর্মী,মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ মোতালিব মিয়ার স্ত্রী আরিনা বেগম। ৭০ এর সাধারন নির্বাচনের মাত্র ৩দিন পূর্বে তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। স্বামী মোতালিব মিয়া শ্রমিকের কাজ করতেন চট্টগ্রাম জেনারেল আয়রন এন্ড ষ্টীল মিলে। চাকুরীরর সুবাদে তখন শ্রমিকনেতা এম,এ,হান্নান, জহুর আহমদ চৌধুরী প্রমুখ প্রখ্যাত রাজনীতিবিদদের সান্নিধ্য লাভের কারনে যুবক মোতালিব আওয়ামীলীগের একজন একনিষ্ট কর্মী হিসাবে জড়িয়ে পড়েন ৬৮ এর ৬ দফা আন্দোলনসহ বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে। ২৫শে মার্চ ঢাকায় গণহত্যার সংবাদ পরদিন চট্টগ্রামে পৌঁছলে মোতালিব ৭ দিন পায়ে হেটে ১লা এপ্রিল কমলগঞ্জের বড়চেগ এসে পৌঁছান তখন মৌলভীবাজারের শেরপুরে পাকবাহিনীর সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের তুমুল যুদ্ধ চলছিল। বাড়ী এসে মোতালিব এলাকার আওয়ামীলীগ কর্মী মনাফ মিয়া, ইছাক মিয়া, মখলিছুর রহমান প্রমুখদের সাথে নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে মুক্তিযোদ্দাদের জন্য অর্থ ও খাবার সংগ্রহ করে তা পৌঁছানোর কাজ শুরু করেন। বিষয়টি আঁচ করতে পেরে পাক হানাদার ও তাদের এদেশীয় দোসররা বেশ কবার হাতে নাতে ধরার প্রচেষ্টা চালিয়েও ব্যার্থ হয়। অগত্য তিনি বাধ্য হয়ে এলাকা ত্যাগ করে প্রথমে মৌলভীবাজারের শ্যামেরকোনাগ্রামে ও পরে রাজনগরের নিদিরমহল গ্রামে আত্মগোপনে থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য খাবারের ব্যাবস্থা করতে থাকেন। পরিস্থিতি যখন ভয়াবহ তখন ২৫শে অক্টোবর রাতে পরিবারের লোকজনের সাথে শেষবারের জন্য দেখা করতে এলে ধরা পড়েন রাজাকারদের হাতে । রাজাকার ছিদ্দেক ও মস্তাফা মিয়ার নেতৃত্বে ৭/৮ জন শসস্ত্র লোক রাতের আধারে বাড়ী ঘেরাও করে ঘরের দরজা ভেঙে মোতালিবকে আটক করে হাত-পা বেঁধে আমানুষিক নির্যাতন চালায়।
হানাদারদের হাত থেকে রেহাই পাননি তার অসুস্থ মা ,ছোট ভাই-বোন ও স্ত্রী আরিনা বেগমও। নরপশুরা বাড়ীর সবার সামনে তার স্ত্রী আরিনা বেগমকে জোরপূর্বক বিবস্ত্র করে পর্যায়ক্রমে পাশবিক নির্যাতন চালায়। ঐদিন রাতেই চোখ বেঁধে মোতালিবকে নিয়ে যাওয়া হয় চৈত্রঘাট রাজাকার ক্যাম্পে। ২৬ শে অক্টোবর তাকে নিয়ে যাওয়া হয় মৌলভীবাজার সার্কিট হাউজ এলাকাস’ পাকবাহিনীর নির্যাতন সেলে। সেখানে টানা ১০দিন নির্যাতনের পর ৪ ডিসেম্বর মোতালিবসহ ৩ জন বন্দীকে নিয়ে যাওয়া হয় তৎকালনি এসডিও বাংলোয় অবস্থানরত পাক মেজর আজিজের সন্মুখে। সেখান থেকে তার সাথের অপর ২ জনকে নিয়ে গুলিকরে হত্যা করা হলেও ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান মোতালিব। তার প্রাণরক্ষার আকুতিতে গলে যায় পাক মেজরের মন। তাকে হত্যা না করে জেল হাজতে প্রেরণ করা হয়। ৭ নবেম্বর তারিখে একইভাবে ধৃত ও নির্যাতনের শিকার হয়ে জেল হাজতে প্রেরিত হন তার অপর সহযোগী ইছাক মিয়াও। মাসাধিককাল কারাভোগের পর ৮ ডিসেম্বর তারিখে মিত্রবাহিনী মৌলভীবাজার শহর আক্রমন করে জেলের দরজা ভেঙে বন্দীদের মুক্ত করলে তারা দু’জনও মুক্ত হন।
দেশ স্বাধীনের পর বিগত ৭৯ সালে মোতালিব ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় তিনি বিদেশে পাড়ি জমান। কিন্তু বিধি বাম, সেখানে এক সড়ক দূর্ঘটনায় পঙ্গু হয়ে দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হন। তিন কন্য সন্তানের জনক মোতালিব সেই থেকে অদ্যাবধি আর্থিক দৈন্যতার কারনে তার পরিবার পরিজনদের নিয়ে অনাহারে অর্ধাহারে দিনাতিপাত করলেও সরকারী সাহায্যের ছিটেফোটাঁও তার ভাগ্যে জোটেনি। স’ানীয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কিংবা সরকারী-বেসরকারীভাবে কেউই এই অসহায় পরিবারটির জন্য সাহয্যের হাত বাড়ানোতো দূরের কথা খোজ নেওয়ারও প্রয়োজন বোধ করেননি। পায়নি মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের স্বীকৃতিটুকুও ।কমলগঞ্জ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, সরকারদলীয় চীফ হুইপ, আওয়ামীলীগ নেতৃবৃন্দসহ অনেকেই বিভিন্ন সময়ে মোতালিবের পরিবারকে অনেক আশ্বাসবানী শুনিয়েছেন কিন’ স্বাধীনতার এই ৩৮ বছরেও সেই আশ্বাস আলোর মুখ দেখেনি।
বর্তমান সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক তালিকা প্রণয়ন ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ঘোষনা দেওয়ায় আশার আলো জ্বলে উঠে আরিনা ও মোতালিবের মনে। তারা সিদ্ধান্ত নেন আদালতে এলাকার যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের। অতঃপর গত ১লা জুলাই /০৯ তারিখে বীর মুক্তিযোদ্ধা মোতালিব নিজে বাদী হয়ে মৌলভীবাজার অতিরিক্ত চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্যাট আদালতে কমলগঞ্জের কুখ্যাত রাজাকার ছিদ্দেক মিয়া সহ ১৫ জনকে আসামী করে একটি পিটিশন মামলা দায়ের করেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, মৌলভীবাজার উকিলবারের কোন আইনজীবির সহায়তা না পাওয়ায় তাকে নিজেই মামলাটি পরিচালনা করতে হচ্ছে।
এদিকে মামলার অভিযুক্তরা এখনও এলাকায় বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং মোতালিবের পরিবারকে নানা প্রকার হুমকী ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করে চলছে। যা জাতীর জন্য খুবই লজ্বাজনক। আরিনা বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন আওয়ামীলীগের একজন একনিষ্ট কর্মী ও একজন মুক্তিযোদ্ধা হওয়া সত্বেও এই মামলার ব্যাপারে তার স্বামী কারো কাছ থেকে কোন সহযোগীতা পাচ্ছেন না। তবে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন, জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকারীদের বিচার যখন এই স্বাধীন বাংলার মাটিতে হয়েছে ,তখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারও অবশ্যই একদিন হবে। তার পরিবারও অবশ্যই ন্যায় বিচার পাবে। বীরাঙ্গনা আরিনাদের বুকে লালিত এই স্বপ্ন বাসএব রূপ লাভ করুক এটাই আজকের দিনের প্রত্যাশা।

পাঠকের মন্তব্যঃ

  1. সদেরা সুজন  বলেছেন:

    জননী আমার, আমরা তোমার কাছে ঋণি, তাবত বাংলাদেশ তোমার কাছে ঋণি, যা শোধ হবার নয়। এদেশের বেঈমান বিশ্বাসঘাতক রাজাকার আলবদর আলসামস কিংবা পতিতা রাজনীতিকদের দিন বদল হয় রাতারাতি লোটেফোটে খায় চোখের পলকে আঙ্গুল ফুল কলাগাছ হয়। টাকার জাহাজ নিয়ে তাবত দেশটাই খেতে চায় অথচো তোমাদের দিন বদল হয় না। এ কষ্ট শুধু তোমার নয় গো মা, স্বাধীনতা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অনেকেরই। স্বাধীনতার পক্ষের দাবিদার সংগঠন আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় থাকলেও তোমাদের দিন বদলেনা, কিন্তু তাদের দিন বড় রাতারাতি করে বদলে যায়।শতকোটি টাকা খরচ করে আনন্দ উতসব করে আর তোমরা বাংলাদেশের জননীরা না খেয়ে মরছো…..! এসব বর্রতা, জঘন্যতা দেখে কষ্টে কষ্টে ঘৃণা জানানোর ভাষা এখণ হারিয়ে ফেলছি। কি করে গর্ব করে বলবো আমরা স্বাধীনতা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষ…..


(আপনার মোবাইল নম্বরটি অপ্রকাশিত থাকবে)


(আপনার ইমেইল এ্যাড্রেসটি গোপন রাখা হবে)


(বাংলায় মন্তব্য লিখতে ইউনিকোড বাংলা সফ্‌টওয়্যার ব্যবহার করুন)

পাতার শুরুতে