বাঘায় ৫’শ বছরের ঐতিহ্যবাহী ঈদ মেলায় লাখো মানুষের ঢল
৫০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী ঈদ মেলায় লাখো মানুষের ঢল নেমেছে। বাঘায় বাঘ নেই, আছে ঐতিহ্যবাহী ঈদ মেলা। মেলা থেকে তাল পাতার বাঁশি আজ আর কেনা হয়ে উঠে না। তবুও জীবন থেমে থাকে না আগের মতই। তবে মেলা হয়, বাঁশি বাজে, খেলা হয়, শিশুরা আনন্দ করে, কোলাহলে মেতে উঠে এ মেলায়। বাংলার ঐতিহ্যবাহী আকর্ষণ হলো পল্লী মেলা। বাঙালীর সংস্কৃতির সাথে জড়িয়ে আছে মেলার গন্ধ। কখনো ঋতু, কখনো কৃষি, কখনো নববর্ষ এবং কখনো ঈদকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠে মেলা। মেলায় দুর-দুরান্ত থেকে লোকজন পরসা নিয়ে আসে। এমন একটি ঈদ মেলার আয়োজন হয়েছে রাজশাহীর বাঘা উপজেলার প্রাণ কেন্দ্রে। যুগে যুগে ক্ষণাজন্ম কালজয়ী পুরুষের আবির্ভাব হয়ে আসছে। কেউ সমাজ দর্পনে, কেউবা বিজ্ঞান বিশেষ অবদান রেখে চলেছে। যা মানব কল্যাণের পথকে প্রশস্থ করতে। আবার কেউ কেউ সমাজ জীবনে মানব গোষ্ঠীকে সঠিক পথে চালিত করার জন্য ধর্মীয় আদর্শের দিক নির্দেশনায় নিয়ে গেছে, এমনি এক মহৎ পুরুষ আব্বাসীয় বংশের হযরত শাহ মোয়াজ্জেম ওরুপে শাহদৌলা (রঃ)। সাধারণ পীঠস্থান বাঘায় তার ও ছেলে হযরত আঃ হামিদ দানিশ মন্দ (রঃ) এর ওফাৎ দিবসে ধর্মীয় উরশ মোবারক উৎসবকে কেন্দ্র করে না প্রতি বছর পবিত্র ঈদুল ফিতরের ঈদে বাঘা ওয়াকফ এষ্টেটের বিশাল এলাকা জুড়ে মেলা বসে। সে মেলা ঈদ মেলা নামে খ্যাত। ঈদের দিন থেকে শুরু হয় ঐতিহাসিক ঈদ মেলা। ঈদের তৃতীয় দিন অর্থাত গতকাল বুধবার ওরশ মোবারক অনুষ্ঠিত হয়। এই ওরশে হাজার হাজার নারী-পুরুষ তবারকে অংশ গ্রহণ করেন। তবারক অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাহিদুল ইসলাম, পৌর ভারপাপ্ত মেয়র আব্দুল কুদ্দুস সরকার, অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাক, থানা ইনচার্জ কর্মকর্তা আলী আহম্মেদ হাশমী প্রমুখ। বাদ যোহর নামাজের পর থেকে হাজার হাজার নারী-পুরুষ তবারক নেন। হযরত শাহদৌলা (রঃ) এর ৪৮১ তম তাঁর ছেলে হযরত আঃ হামিদ দানিশ মন্দ (রঃ) এর ৩৮২ তম ওরশ উৎসবকে কেন্দ্র করে মেলা আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে অবহিত করেন। মেলা শব্দটির মধ্যে লুকিয়ে আছে বাঙালীর উদ্দীপনার স্পর্শ। মেলাকে কেন্দ্র করে যে সাজ সাজ রব তার মধ্যে দিয়ে ‘প্রকাশিত’ এলাকাবাসীর মনের ফাল্গুন ধারা। রাজশাহী বিভাগীয় শহর থেকে ৪৫ কিঃ মিঃ পূর্ব-দক্ষিণ কোনে বাঘা উপজেলা অবস্থিত। বাঘা নামক গ্রাম ছিল হযরত শাহদৌলা (রঃ) ও তদ্বীয় ছেলে হযরত আঃ হামিদ দানিশ মন্দ (রঃ) এর সাধনার পীঠস্থান। বাঘা ওয়াকফ এস্টেট ও শিল্প মহিমার বিষ্ময় জাগরিত স্থাপত্য নকশার অন্যন্য নিদর্শন বাঘা শাহী মসজিদের ভিতরে প্রবেশ পথের উত্তর গেটের বামদিকে হযরত শাহদৌলা (রঃ) এর রওজা শরীফ অবস্থিত। এখন থেকে প্রায় ৫০০ বছর আগে সুদূর বাগদাদ থেকে ৫ জন সংগীসহ ইসলাম প্রচারের জন্য এসেছিলেন এবং জেলার পূর্ব দক্ষিণ কোনে পদ্মা নদীর কাছে বাঘা নামক স্থানে বসবাস শুরু করে নিজের চরিত্র, মাধুর্য, ব্যবহার ও আত্মিক শক্তির বলে ওই এলাকার জনগণের মধ্যে ইসলাম প্রচারে সাফল্য লাভ করেন। ওই এলাকার মানুষ তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তার আত্মিক ক্ষমতার প্রভাবে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে ধন্য হয়েছে। ঘটে যাওয়া অলৌকিক ঘটনার বিবরণ পাওয়া যায়। বহুল প্রচলিত জনশ্র”তি রয়েছে যুবরাজ শাহজাহান রাজকার্য ব্যাপী দেশে বজরায় নদী পথে ঢাকা যাওয়ার সময় হঠাৎ ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েন। এ সময় তিনি ওই এলাকায় বজরা ভীড়ানোর পরে একজন কামেল দরবেশের সন্ধান পান। যুবরাজ উক্ত দরবেশ শাহদৌলা (রঃ)’র আস্তানায় গিয়ে তার অসুস্থতার কথা বর্ণনা করেন। দরবেশের দোয়ার বরকতে যুবরাজ আরোগ্য লাভ করেন এবং ওই দিন তার আস্তানায় আতিথ্য গ্রহণ করেন। সেই দিন যুবরাজের বিশেষ দুত এসে সংবাদ দেয় যে ঢাকার শত্র”রা পরাজিত হয়েছে এবং বিজয় যুবরাজের করায়ত্ত। এই আশ্চর্য ঘটনা দরবেশের কেরামতি বলে মনে করেন। হযরত শাহদৌলা (রঃ) এর চার ছেলের মধ্যে একমাত্র ছেলে আঃ হামিদ দানিশ মন্দ জীবিত ছিলেন। তিনিও বাবার মতো আধ্যাত্মিক সাধক হিসাবে খ্যাতি অর্জন করেন। তার প্রচেষ্টায় বাঘায় ইসলাম ধর্ম ব্যাপক বিস্তার লাভ করে। সাধনার পীঠস্থান বাঘায় ওয়াত দিবস উপলক্ষ্যে প্রতি বছর ৩ শাওয়াল পবিত্র ওরশ মোবারক অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। ধর্মীয় এ ওরশ মোবারককে কেন্দ্র করে প্রতি বছর পবিত্র ঈদুল ফিতরের ঈদে এলাকা জুড়ে মেলা বসে। এ মেলার প্রথম দিকে লোক সংখ্যা কম হতো। পর্যায়ক্রমে মেলার পরিধি বাড়তে থাকে। ওয়াকফ এষ্টেটের মাজার পরিচালনা কমিটি ধর্মীয় আয়োজন ওরশ ও মেলা পরিচালন করে থাকেন। মেলার আদায়কৃত অর্থ ব্যয় করা হয়ে থাকে ওরশ ও মাজারের উন্নতি কল্পে। ঈদ মেলার ন্যায় ঈদুল ফিতরের ঈদে এতবড় উৎসব দেশের অন্য কোথাও হয়েছে বলে জানা যায়নি। এই মেলা সপ্তাহ ব্যাপী চলবে। এবারে এই মেলার বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে চলছে সার্কাস, যাত্রা, নাগর দোলা, মটরসাইকেল, কারগাড়ী ঘোরান খেলা। পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে শুরু হয় ওরশ অনুষ্ঠান। সারারণত ধরে চলে ভক্তদের জিকির আজগার, সামা কাওয়ালী। পাপ মোচনের জন্য পুণ্য লাভের আশায় দেশে ও বিদেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজার হাজার নারী-পুরুষ আসে ঈদুল ফিতরের নামায আদায় করতে ও পবিত্র ওরশ মোবারকে। আগত নর-নারীরা ওরশ ও নামাযে যোগ দিতে শাহী মসজিদ ও খানকা বাড়ীর পূর্বে অবস্থিত ঐতিহাসিক বিশাল দিঘীতে গোসল করে নিজেদেরকে পবিত্র করে। জনশ্র”তি রয়েছে দিঘির পানিতে গোসল ও পানি পান করলে আওলিয়াদের দোয়ার বরকতে নেক আশা পুরণ হয়। দূরবর্তী অঞ্চল থেকে আগত যাত্রীরা খানকা বাড়ীর ভিতরে অস্থায়ী আশ্রয়ে, কেউ আত্মীয় স্বজনদের বাড়ীতে, স্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বারান্দায় অবস্থান নেয়। মসজিদের উত্তর গেট থেকে শুরু করে খানকা বাড়ী পর্যন্ত বিভিন্ন বয়সের নারী পুরুষ ভিক্ষুক দু’সারিতে খোলা আকাশের নিচে দিনরাত একই ভাবে বসে থাকে টাকা পয়সা রোজগারের আশায়। মনোবাসনা পুরণের জন্য অনেকে মান্নতের জন্যে নিয়ে আসে নগদ অর্থসহ চাল, ডাল, খাসি, মোরগ ইত্যাদি। কর্তৃপক্ষ সব গ্রহণ করে ওরশ ও মাজার উন্নয়নের কাজে ব্যয়ের জন্য। পবিত্র ওরশ উপলক্ষ্যে দুই সপ্তাহ ব্যাপী ধর্মীয় ঈদুল ফিতরের ঈদের এ মেলায় দেশের দূর-দূরান্ত থেকে হাজার হাজার নারী পুরুষ আসে মেলা দেখা ও আনন্দ উপাভোগ করার জন্য। মুসলমানদের ধর্মীয় প্রধান উৎসব হলেও সকল স¤প্রদায়ের মানুষ আসে এ মেলায়। মেলা উপলক্ষ্যে বিভিন্ন রকমের পণ্য ব্যবসায়ী ছোট-বড় সব মিলিয়ে প্রায় দুই হাজার দোকানী তাদের পসরা সাজিয়ে বসে মেলায় বেচাকেনা করার জন্য। গভীর রাত পর্যন্ত সকল পণ্যই বেচাকেনা হয়। মেলাই পাওয়া যায় সব ধরনে মিষ্টি, বাচ্চাদের খেলনা, মনোহারি সামগ্রী, লোহা জাত দ্রব্য, কাঠের আলনা, চেয়ার, টেবিল, খাট, ড্রেসিং টেবিল, পালঙ্ক, সুকেচ, মাটির হাড়ি পাতিল, প্রসাধনী সামগ্রী, মাংস, বেকারী দ্রব্যাদি, শামুকের মালা, কাঠের সামগ্রী, বেলুন, বাঁশি এছাড়া ছবির দোকান, খাবার হোটেল, সদর ঘাটের পান, চা স্টল প্রভৃতি। মাজারের প্রধান গেটের দু-সারিতে বসে কসমেটিকস্ সহ বিভিন্ন রকমের খেলনা জাতীয় পণ্য ব্যবসায়ীরা। বাঁশ, বেত, স্টিল ও কাঠের তৈরী জিনিসের অপূর্ব সমারোহে বাঘার কলেজ মাঠ পরিপূর্ণ হয়। মাটির তৈরী ও লোহার ব্যবহার্য দ্রব্যাদিসহ বাচ্চাদের খেলনা সামগ্রী বিক্রেতারা বসে হযরত শাহশের আলী (রঃ) এর মাজারের চারপাশে। মৃৎ শিল্পীরা মেলায় নিয়ে আসে মাটির তৈরী বিচিত্রময় জিনিসপত্র। ঈদের নামায আদায়ের পর ঈদগা মাঠে বসছে প্রতিদিন জুয়ার আশড়। বাঘা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে সার্কাস, সাংস্কৃতিকসহ বিভিন্ন আকর্ষণীয় খেলা দেখানো হচ্ছে। রাত ১২ টার পরে এই প্যান্ডেলেই চলছে যাত্রা। উলেখ্য ৯ আগষ্ট মাজার চত্বরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শহিদুল ইসলামের সভাপতিত্বে এবছর মেলা ২৫ লক্ষ ২০ হাজার টাকায় ইজারা দেয়া হয়েছে। ইজারা নিয়েছে উপজেলা সাবেক ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক মামুনুর রশিদ।
আমানুল হক আমান, বাঘা প্রতিনিধি, রাজশাহী ।













