ভারী বর্ষনে মৌলভীবাজারে বন্যা : বড়লেখা-মৌলভীবাজার সড়ক যোগাযোগ বিছিন্ন
বিশ্বজিৎ রায়, মৌলভীবাজার প্রতিনিধি : দুদিনের টানা ভারী বর্ষনে ও পাহাড়ী ঢলে মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলায় দেখা দিয়েছে বন্যা। বন্যায় উপজেলার অর্ধশতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে এবং প্রায় ৩০ হাজার লোক পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। আউশ, আমন চারা ও সবজির ব্যাপক ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে। অপরদিকে টানা
বর্ষণে জেলাসদরসহ বিভিন্ন উপজেলায় সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা। প্রধান সড়কের উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ায় জেলা শহরের সাথে বিভিন্ন উপজেলার সড়ক যোগাযোগ বিছিন্ন হয়ে পড়েছে।সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, শুক্রবার ভোর রাত থেকে টানা বর্ষনে ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানিতে কমলগঞ্জ উপজেলার ধলাই নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে মুন্সিবাজার ইউনিয়নের সুরানন্দপুর এলাকার পূর্বের সেচ দেওয়া ড্রেনের মধ্যে ভয়াবহ ভাঙ্গনের সৃষ্টি হয়। এছাড়াও ধাতাইলগাঁও, চৈতন্যগঞ্জ, নারাইনপুর, ইসলামপুর ইউনিয়নের কোনাগাঁও, মাধবপুর ইউনিয়নের শুকুরউল্লা গ্রাম ও আদমপুর ইউপির কেওয়ালীঘাট, পশ্চিম ঘোড়ামারা গ্রাম এলাকা দিয়ে ধলাই নদীর নতুন ও পুরাতন মোট ৭টি স্থানে ভাঙ্গনের ফলে আকষ্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়েছে। এবং আরও কয়েকটি ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে ভাঙ্গনের আশঙ্কা রয়েছে। ধলাই নদীর সাথে সম্পৃক্ত মাধবপুর ইউনিয়নের জবলাছড়া, লংগুছড়া দিয়েও পানি বেরিয়ে বন্যায় ইসলামপুর ইউনিয়নের ৪টি, মাধবপুরে ৯টি, কমলগঞ্জ সদরে ৬টি, আদমপুরে ৭টি, আলীনগরে ৮টি, মুন্সিবাজারে ১৫টি, পতনউষার ইউনিয়নে ৮টি, পৌরসভা এলাকায় ৪টি গ্রাম বন্যা প্লাবিত হয়েছে। বন্যার পানিতে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ পানি বন্দি হয়ে পড়েছেন। এরিপোর্ট লেখা পর্যন্ত বৃষ্টি অব্যাহত রয়েছে এবং বন্যার পানি বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। মাধবপুর ইউনিয়নের হীরামতি গ্রামের অস্বীনি দাস, অনিল দাস, প্রহল্লাদ দাস বলেন, তাদের ২০টি ঘরের ভেতরে হাঁটু পানি রয়েছে। বন্যার পানি আরও দ্রুত বেগে বৃদ্ধি পাওয়ায় তারা ঘরের মালামাল সরিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিচ্ছেন। মুন্সিবাজার ইউপি সদস্য শফিকুর রহমান বলেন, বন্যায় তাদের ইউনিয়নের ২৩টি গ্রাম প্লাবিত হয়ে পড়েছে। তাছাড়া যেহারে পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে আরও বন্যা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কমলগঞ্জ পৌরসভার প্যানেল মেয়র-১ মো: আনোয়ার হোসেন জানান, কমলগঞ্জ সদর ইউনিয়নের নারাইনপুর গ্রামের ধলাই নদীর ভাঙ্গনের পানিতে কমলগঞ্জ পৌরসভার ৮ ও ৯নং ওয়ার্ডের ৪টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। তাছাড়া ভানুগাছ বাজারের বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে এবং ধলাই নদীর বাঁধ চুইয়ে বন্যার জল বাজার এলাকায় প্রবেশ করছে। কমলগঞ্জ সদর, মাধবপুর, মুন্সিবাজার ও পতনউষারে বেশ কিছু সংখ্যক বাড়ি বন্যায় তলিয়ে যেতে শুরু করেছে। বন্যার খবর পেয়ে শনিবার সকালে মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা দ্বীপক রঞ্জন দাস ও কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রকাশ কান্তি চৌধুরী, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান সরেজমিন ধলাই নদীর ভাঙ্গন এলাকা ও বন্যা প্লাবিত অঞ্চল পরিদর্শন করেছেন। কমলগঞ্জ কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, এ পর্যন্ত ১শ, হেক্টর আউশ ও ২০ হেক্টর সবজির ক্ষতি হয়েছে। মাধবপুর ইউপি চেয়াম্যান পুষ্প কুমার কানু, ইউপি সদস্য মোতাহের আলী জানান, এই ইউনিয়নের হীরামতি গ্রামে ধলাই নদীর বাঁধটি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। স্থানীয় জনসাধারণের সহায়তায় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে ধলাইর পার, শুকুরউল্লাগাঁওসহ ৮/৯টি গ্রাম পানিতে নিমজ্জ্বিত রয়েছে। আদমপুর ইউপি চেয়ারম্যান সাব্বির আহমদ ভূঁইয়া বলেন, শনিবার দুপুরে ধলাই নদীর কেওয়ালীঘাট ও পশ্চিম ঘোড়ামারা এলাকায় ভাঙ্গনের সৃষ্টি হয়ে কেওয়ালীঘাট, ঘোড়ামারা, আধকানি, নাজাতকোনা, মধ্যভাগ, কোনাগাও, ছনগাঁও, উত্তরভাগ গ্রাম পানিতে নিমজ্জ্বিত হয়ে পড়ে।কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রকাশ কান্তি চৌধুরী বলেন, বোরো মৌসুমে মুন্সিবাজার ইউনিয়নের সুরানন্দপুর এলাকায় ধলাই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধের মধ্য দিয়ে ড্রেন করে সেচ দেওয়ায় ভয়াবহ শুক্রবার গভীর রাতে বাঁধের উপরের গাছ উপড়ে পড়ে ভয়াবহ ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। বন্যায় ক্ষয়ক্ষতি ও ত্রাণ সহায়তা বিষয়ে কমলগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান জানান, ধলাই নদীর ৪টি স্থান দিয়ে ভাঙ্গনে বন্যার সৃষ্টি হয়েছে। তবে দ্রুত ত্রাণ বরাদ্ধের জন্য উর্দ্ধতন অফিসে আবেদন জানানো হয়েছে।
এদিকে মৌলভীবাজার-বড়লেখা সড়কের বিভিন্ন স্থানে রাস্তার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ায় জেলার সাথে জুড়ী ও বড়লেখা উপজেলার সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। বড়লেখা পৌরসভার বিভিন্ন ওয়ার্ডে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হওয়ায় জনজীবনে নেমে এসেছে চরম দূর্ভোগ। মাধবকুন্ড ইকোপার্কের এলাকায় পাহাড় ধ্বসের কারনে যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ থাকার ফলে শুক্রবার কোন পর্যটক মাধবকুন্ড জলপ্রপাতে যেতে পারেনি। তাছাড়া বড়লেখার ডিমাই সহ বিভিন্ন স্থানে পাহাড় ধ্বসের উপজেলার আভ্যন্তরীন যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গেলেও হতাহতের কোন খবর পাওয়া যায়নি। অবিরাম বর্ষনের কারনে জুড়ী ও সুনাই নদীর পানি বেড়ে গিয়ে হাকালুকি অঞ্চলের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হচ্ছে। তলিয়ে গেছে আউশ ধানের বীজতলা। বড়লেখা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মোঃ আমিনুর রহমান জানান, অবিরাম বর্ষনের কারনে বড়লেখা উপজেলায় বন্যা দেখা দিয়েছে। বন্যা আক্রান্ত ক্ষতিগ্রস্থ লোকদের তালিকা তৈরী জেলা প্রশাসনে পাঠানো হবে। এদিকে শুক্রবার ভোর রাত থেকে টানা ভারী বর্ষণের ফলে কমলগঞ্জের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের পাহাড়ি এলাকায় ভ‚মি ধ্বস ও গাছ পড়ে বিদ্যূৎ বিপর্যয় ঘটে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মাঝে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় সংস্কার শেষে সাড়ে ৮ ঘন্টা পর কমলগঞ্জে পূনঃরায় বিদ্যূৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হয়। মৌলভীবাজার পল¬ী বিদ্যূৎ সমিতি (পবিস) কমলগঞ্জ জোনালের জুনিয়র প্রকৌশলী নাসির হোসেন জানান, ভারী বর্ষণ হলেই পাহাড়ি এলাকায় ভ‚মি ধ্বসসহ গাছ উপড়ে পড়ায় বিদ্যূৎ বিপর্যয় ঘটেছে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মাঝে বিদ্যূৎ কর্মীরা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় মেরামত কাজ শেষ করে সাড়ে ৮ ঘন্টা পর শুক্রবার বিকাল সাড়ে ৩ টায় আবারও বিদ্যূৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করেছেন।











