পত্নীলার শহীদুল পেঁপের চারা বিক্রি করে এখন স্বাবলম্বী
কিউ,এম,সাঈদ টিটো, নওগাঁ প্রতিনিধি : দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে নিজে পেঁপের চারা তৈরী করে বিক্রি করে স্বাবলম্বী হয়েছেন নওগাঁর পত্নীতলার শহীদুল ইসলাম (৫০)। উপজেলার কৃষ্ণপুর ইউনিয়নের গোপীনগর সোনাডাঙ্গা গ্রামের দৈমুদ্দিন এর ছেলে শহীদুল জানান, তিনি এই পেঁপের চারা বিক্রি করেই ভূমিহীন থেকে পরিণত হয়েছেন সম্পদের মালিকে। নিজে নিরক্ষর হলেও সন্তানদের শিক্ষিত করে তুলেছেন। শিক্ষিত না হয়েও আর দশটা মানুষকে শিক্ষা দিতে পারছেন কিভাবে পেঁপে গাছের পরিচর্চা ও লালন করতে হয়। এ কাজের মাধ্যমে তিনি সংসারের ব্যয় ভার মিটানোর পাশাপাশি মানুষকে ভাল কাজের পরামর্শ দিতে পারার জন্য নিজে নিজে আত্মতৃপ্তি লাভ করেন। স্ত্রী, এক ছেলে আর এক মেয়ে নিয়ে এখন তার সুখের সংসার। ১৯৯২ সালে তার এক আত্মীয় অসুস্থ হয়ে পড়লে ডাক্তার তাকে পাকা পেঁপে খাওয়ানোর পরামর্শ দেন। কিন্তু সমস্যা হলো পাকা পেঁকে কোথায় পাওয়া যাবে। এলাকায় পাকা পেঁপে না পেয়ে তিনি বাধ্য হয়ে বাড়ি থেকে ৪২ কিলোমিটার দূরে নওগাঁ জেলা সদরে যান পাকা পেঁপে কিনতে। সে সময় রাস্তা ঘাট ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না থাকায় নওগাঁ যেতে খুব সমস্যা হয়েছিল। শুধু তাই নয়, পেঁপে কেনার জন্য যে ব্যয় হয়েছিল যাতায়াত করতে তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশী খরচ হয়ে যায়। রোগিকে পেঁপে খাওয়ানোর পর তিনি বীজগুলো সংগ্রহ করে বাড়ির আশেপাশে রোপণ করেন। সেখানেই তৈরী করেন চারা। সেই থেকে তার পেঁপে চারা তৈরী ও বিক্রয়ের সূচনা। মানসম্মত পেঁপে চারা তৈরী ও ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে তিনি জানান, পলিথিনের কাগজ দিয়ে ছোট ছোট প্যাকেট তৈরী করে নিতে হয়। সুষম সার সমৃদ্ধ পলি ও দোঁয়াশ মাটি দিয়ে প্যাকেটগুলো ভরাতে হয় এবং প্রতি প্যাকেটে একটি অথবা দু’টি বীজ দিতে হয়। ১৭/১৮ দিনের মধ্যে চারা বিক্রয় উপযোগি হলে বিভিন্ন হাট বাজার ও ভ্যানে ফেরি করে বিভিন্ন এলাকায় বিক্রয় করে থাকেন তিনি। ভালো গাছ তৈরীর জন্য চারা রোপণের আগে ছয় ফিট পর পর এক ফিট গভীর ও দুই ফিট প্রস্থ গর্ত করে নিতে হয়। মাটির সাথে সবুজ ও জৈবসার মিশিয়ে গর্তগুলো প্রায় এক ফুট উচুঁ করে ভরাট করে তাতে চারা রেপণ করতে হয়। চারা রোপণের সময় পলিথিনের প্যাকেটটি ব্লেট দিয়ে কেটে নিতে হবে। পেঁপের চারা রোপণের ৯০ দিনের মধ্যে গাছে গুটি আসে এবং পাঁচ মাসের মধ্যে ফল খাওয়া যায়। আর পাকা পেঁপে পেতে হলে নয় মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। তিনি বলেন, এলাকায় তিন জাতের পেঁপে চাষ হয়ে থাকে। এগুলো হলো গোল মডেল, কলসি মডেল ও থাইল্যান্ড থেকে আনা রেড লিফ নামের একটি জাত। এই জাত এলাকায় চাষ হলেও তা ক্রস জাত নামে পরিচিত। পাকা বাড়ির ছাদ সহ বসতবাড়ির আশে পাশে পেঁপে চাষ করা সম্ভব বলে তিনি জানান। শহিদুলের এই উদ্যোগের ফলে পত্নীতলা ছাড়াও পার্শ্ববর্তী উপজেলাগুলোতে পেঁপে চাষের ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে । এ ছাড়া বিভাগীয় শহর রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকার লোকজন তার নার্সারীতে এসে পেঁপের চারা সংগ্রহ করেন। প্রতিটি চারা তিনি এক থেকে দুই টাকায় বিক্রয় করেন। তিনি পেঁপে চাষীদের কাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করে থাকেন। তিনি জানান, এক সময় আমার কিছুই ছিলনা। সরকারের কাছ থেকে বন্দোবস্ত নেয়া ২২ শতকের একটি খাস জায়গায় বাড়ি করে তিনি স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে বাস করছেন। ছেলে সোহেল দশম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করে ঢাকায় একটি গার্মেন্টে চাকুরি করেন। মেয়ে সামসুন্নাহার নজিপুর সরকারি ডিগ্রি কলেজে দ্বিতীয় বর্ষে লেখাপড়া করছেন। ইচ্ছে আছে মেয়েকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করাবেন। পেঁপে চারার ব্যবসা করে ভালো একটি বাড়ি তৈরীর পাশাপাশি একটি ছোট পুকুর খনন করেছেন তিনি। মেয়ের লেখাপড়া সহ সংসারের সকল ব্যয় ভার এর মাধ্যমেই নির্বাহ হয়। আর কারো নিকট হাত পাততে হয় না। এখন তার স্বপ্ন হলো পেঁপের পাশাপাশি একটি বড় নার্সারি গড়ে তোলা।











