পুরীর সমুদ্র সৈকতে অনন্য বালি শিল্প মন কাড়ছে পর্যটকের
দীপক রায়, ভারত থেকে : সমুদ্রের তীরের পুরী শহরে জন্ম বলেই হয়তো সমুদ্রের প্রতি মায়াটা একটু বেশী, একটু অন্য রকমের। তাই পড়াশুনো করে একদিন বালি শিল্পী হয়ে উঠলেন তরুন নায়েক। অবশ্য উড়িষ্যার পুরীতে বালি শিল্পী তরুন একা নন। শুধু পুরীর সমুদ্র সৈকতেই নয় নয় করে ২০ জন বালি শিল্পী মেতে আছেন তাদের শিল্পকলা নিয়ে। নিমেষেই যারা গড়ে ফেলেন কোন মডেল, দেবতা বা মনীষির মুখ। যতদুর জানা গেছে, ভারতের উড়িষ্যাতে বালির জাদুকর সুদর্শন পট্টনায়েকের হাত ধরেই এই বালি শিল্পের সুচনা। তাঁর আগে ভারতে কেউ বালি নিয়ে এমন কাজ করেছে বলে জানা যায়নি। কোনো আর্ট স্কুলেও এই নিয়ে কোনো কোর্স ছিল বলে শোনা যায়নি। অবশ্য সুদর্শন যেটুকু করেছেন, তা তার নিজের প্রতিভার জোরেই। বালি দিয়েই গোটা দুনিয়ার সামনে উজ্জ্বল করেছেন ভারতীয় বালি শিল্পের মুখ।
পুরীর সমুদ্র সৈকতে কথা হচ্ছিল বালি শিল্পী তরুন নায়েকের সাথে। তিনি এই কাজ শিখেছেন তার গুরু মনমোহন মহাপাত্রের কাছ থেকে। তিনি মাত্র কয়েকঘন্টায় সমুদ্রের পাড়ে বালি দিয়ে তৈরী করে ফেললেন একটি মৎস্যকন্যার মডেল। তার কাজ দেখে তারিফ করতেই হয়। পুরীতে ঘুরতে আসা মানুষ সেই শিল্প দেখে যে যা খুশি হয়ে দেন, সেটাই তরুন নায়েকের রোজগার। কোন পর্যটক খুশি হয়ে কিছু দেন, আবার কেউ কিছুই দেন না। তবুও কাজপাগল তরুনের মত জনা কুড়ি শিল্পী বালি দিয়ে অসাধারন সব ভাস্কর্য বানিয়েই যাচ্ছেন। আর এগুলোর আয়ু মাত্র কয়েক ঘন্টা। প্রতি রাতেই জোয়ারের জল এসে ধুয়ে সাফ করে দিয়ে যায় শিল্পীর সৃষ্টিকে। তবে উড়িষ্যা সরকার ইদানীং এই বালি শিল্পকে নিয়ে ভাবনাচিন্তা করছে বলে তরুন নায়েক বেশ আশাবাদী।
ভারত ছাড়িয়ে বিশ্বের বিভিন্ন সৈকতে বালি ভাস্কর্য প্রদর্শন করে বেশ নামডাক এবং পয়সা রোজগার করে আসছেন সুদর্শন পট্টনায়েক। এখন বালির তৈরি শিল্পকর্মই তাঁর আয়ের একমাত্র উৎস। বন্ধুদের সহযোগিতায় উড়িষ্যায় ১৯৯৪ সালে গড়ে তুলেছিলেন ‘গোল্ডেন স্যান্ড আর্ট ইনস্টিটিউট’। সেখানে বালি ভাস্কর্য বানানো শেখানো হয়। মজার ব্যাপার হল সেখানে ইনস্টিটিউটের কোনো দেয়াল নেই, পায়ের নিচে বালি আর মাথার ওপর খোলা আকাশ। সামান্য কয়েকজন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল এই প্রতিষ্ঠান। আর এখন প্রতিবছর এরা সরকারী সাহায্য নিয়ে ডিসেম্বর মাসে বালি শিল্প প্রদর্শনীর আয়োজন করে থাকে। বালি দিয়ে পুরীতে তৈরি হয়েছে বিশ্বের প্রায় সব জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বের ভাস্কর্য। হয়েছে প্রায় সব দেবতার অবয়ব। বাদ যায়নি তাজমহল, সান্তা ক্লজের ভাস্কর্যও। লন্ডন, ফ্রান্স, চীন, ইতালি, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডস, জাপান, স্পেনসহ বিভিন্ন দেশে প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছে এখানকার শিল্পীরা। বালি শিল্প নিয়ে একটি বইও লিখেছেন সুদর্শন পট্টনায়েক। বিবিসি ও সিএনএন ইত্যাদি চ্যানেল তুলে ধরেছে এদের কাজ।
কিভাবে তৈরী হয় এই শিল্পকর্ম? তরুন নায়েক জানালেন, ‘এই ভাস্কর্যের একমাত্র কাঁচামাল হলো বালি। তাই, শিল্পীদের পছন্দের জায়গা সমুদ্র সৈকত। বালির জন্য এখানে টাকা লাগে না। বালিতে শুধু হিসেব করে জল মেশালেই হয়। ৮ ভাগ বালির সঙ্গে ১ ভাগ জল মেশালে তবেই টিকবে ভাস্কর্য। আর লাগবে দুখানি হাত আর পরিশ্রম। সাথে শিল্পী মন। তাতেই সমুদ্রের পাড়ে গড়ে ওঠে দারুন দারুন সব ভাষ্কর্য।











