তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবিতে সরকারকে ৯০ দিনের আলটিমেটাম দিয়েছেন বিএনপি
বিএনবি নিউজ ডেস্ক : তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবিতে সরকারকে ৯০ দিনের আলটিমেটাম দিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। আগামী ১০ জুনের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহাল না করা হলে ১১ জুন ঢাকায় মহাসমাবেশ করে আরো কঠোর কর্মসূচি দেবেন তিনি। একই সঙ্গে সোমবারের মহাসমাবেশে বিভিন্নভাবে বাধা দেওয়ার প্রতিবাদে ২৯ মার্চ সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছেন বিএনপি প্রধান।সোমবার রাজধানীর নয়াপল্টনে আয়োজিত বহুল আলোচিত মহাসমাবেশ থেকে এসব ঘোষণা দেন বিরোধী দলের নেতা।চার দলীয় জোট সম্প্রসারণের ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, ‘চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আমরা চারদলীয় জোট সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। বিএনপি ও সম্প্রসারিত জোটের পক্ষ থেকে বলছি- আগামী ১০ জুনের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহাল করা না হলে ১১ জুন ঢাকায় সমাবেশ করে আরো কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে।’এ ছাড়া সরকারের নানামুখী ব্যর্থতা, নিপীড়ন-নির্যাতনের প্রতিবাদে এপ্রিল মাস জুড়ে সারাদেশে বিক্ষোভ সমাবেশ ও কৃষি উপকরণের মূল্য বৃদ্ধি প্রতিবাদ এবং কৃষি পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার দাবিতে মে মাস জুড়ে উপজেলা-থান ঘেরাও কর্মসূচির ঘোষণা দেন খালেদা জিয়া।প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘কারো কোলে চড়ে নয়, জনগণের ভোটে আগামীতে আমরা ক্ষমতায় যাব।আয়নায় নিজের মুখ দেখার পরামর্শ দিয়ে প্রানমন্ত্রীর উদ্দেশ্য তিনি বলেন, ‘আপনার এই বক্তব্য থেকে কি আমরা ধরে নেব মইনউদ্দিন-ফখরুদ্দীন একইভাবে আপনাকে ক্ষমতায় বসিয়েছে। এমন কোনো বক্তব্য দেবেন না যাতে দেশের মানুষ লজ্জা পায়।’খালেদা জিয়া বলেন, ‘তারা (সরকার) অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ ভাষায় ব্যক্তিগত আক্রমণ করে কথা বলেন, যা কোনো সুস্থ রুচিসম্পন্ন মানুষ বলে না। আমি এসবের জবাব দিয়ে পরিবেশ নষ্ট করতে চাই না।’সরকারের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের ফিরিস্তি তুলে ধরে খালেদা জিয়া বলেন, ‘আমরা জনগণকে কখনো মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেই না। আগামীতে ক্ষমতায় গেলে হানাহানি বন্ধ করে উৎপাদনের রাজনীতি চালু করব, দুর্নীতি
বন্ধ করব, বিচার বিভাগ ও মিডিয়াকে পূর্ণ স্বাধীনতা দেব, শাসনতন্ত্র থেকে জনবিরোধী ধারাগুলো বাদ দেব, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা আরো শক্তিশালী করে জনপ্রতিনিধিদের ক্ষমতা বৃদ্ধি করব, দ্রব্যমূল্য ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে নামিয়ে আনবো, বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করব, সকল দেশের সঙ্গে মর্যাদাপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করব, গভীর সমুদ্রবন্দর স্থাপন করে বিদেশের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণ করব, কিভাবে বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা যায় সে ব্যাপারে উদ্যোগ নেব, ক্ষতিকারক কুইক রেন্টাল পদ্ধতি বাতিল করে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি করব, গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করে বন্ধ কলকারখানা চালু করব, রেলওয়ের ব্যাপক উন্নয়ন সাধন করব, ঢাকার যানজট নিরসন করব, ভর্তুকি বাড়িয়ে কৃষি উপকরণের দাম কমাবো, গ্রাজুয়েট পর্যন্ত বিনা বেতনে পড়ালেখার সুযোগ সৃষ্টি করব, দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা প্রদান করবো, ১ কোটি লোককে রেশনের আওতায় আনব ও বয়ষ্কভাতা বৃদ্ধি
করবো।’‘গত ৩ দিন সরকার সবকিছু বন্ধ করে না দিলে মানুষের ব্যবসা-বাণিজ্য হতো, অর্থনীতি ভালোভাবে চলতো’ উল্লেখ করে খালেদা জিয়া বলেন, ‘দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা এতটাই খারাপ যে দেরিতে হলেও অর্থমন্ত্রী বলছেন- আমাদের অর্থনীতি ভালো নেই।’‘বর্তমান সরকার মইনউদ্দিন-ফখরুদ্দীনের
সরকার’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী জনপ্রিয়তার কথা বলেন। কিন্তু তিনি নিজে কিভাবে ক্ষমতায় এসেছেন, কিভাবে আসন পেয়েছেন তা তিনিই ভালো বলতে পারবেন। আমরা জনগণের ভোটেই ক্ষমতায় যাবো।’বিএনপির প্রতিটি কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক দাবি করে খালেদা জিয়া বলেন, ‘সরকারি দলের লোকেরা অস্ত্র
নিয়ে, হকিস্টিক নিয়ে মিছিল করে। আর পুলিশ তাদের পাহারা দেয়। এটা কেমন গণতন্ত্র?’ তিনি বলেন, ‘সরকার কোনো দলের হয় না। কিন্তু এ সরকার জনগণের সরকার নয়, আওয়ামী লীগের সরকার।’ ‘বর্তমান সরকার রাষ্ট্রের চারটি স্তম্ভই ভেঙে ফেলেছে অভিযোগ করে খালেদা জিয়া বলেন, ‘তারা সংসদকে ঠুঁটো জগন্নাথে
পরিণত করেছে, প্রশাসনকে করেছে স্থবির, বিচার বিভাগকে করেছে নির্লজ্জ দলীয়করণ, আর মিডিয়ার ওপর আরোপ করেছে নিয়ন্ত্রণ।তিনি বলেন, ‘দেশে এখন
বিচার দুই ধরনের। আওয়ামী লীগের জন্য এক রকম। আর বিরোধী দল ও সাধারণ মানুষের জন্য অন্যরকম। আওয়ামী লীগ হলে খুনির আসামিরাও ছাড় পেয়ে যায়। আর বিএনপি কর্মীরা অপরাধ না করলেও তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। জামিন চাইলে জামিন দেওয়া হয় না। এ পর্যন্ত তাদের সাড়ে সাত হাজার মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে। আর বিএনপি কর্মীদের বিরুদ্ধে দেওয়া হয়েছে নতুন নতুন মামলা।তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা সরকার রুদ্ধ করে দিয়েছে। কথা না শুনলে সংবাদপত্র ও টিভি বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। মহাসমাবেশ সরাসরি সম্প্রচার করতে বাংলাভিশন, একুশে টিভি ও এনটিভি প্রস্তুতি নিয়েছিল। সরকার অনুমতি দেয়নি।’বর্তমান সরকারের আমলে এ পর্যন্ত ১৫ জন সাংবাদিককে হত্যা করা হয়েছে উল্লেখ করে বিরোধী দলের নেতা বলেন, ‘সর্বশেষ সাগর রুনিকে হত্যা করা হয়েছে। এখন আর এ হত্যার বিচার হবে না।’তিনি বলেন, ‘যেখানে প্রধানমন্ত্রী নিজে বলেছেন, সব আলামত মুছে গেছে সেখানে আর বিচারের আশা করি কিভাবে।’ ‘নিজেরা আলামত মুছে ফেলে জনগণকে বলবেন-আলামত মুছে গেছে, তা হবে না।’ বলেন খালেদা জিয়া।তিনি সাংবাদিকদের চলমান আন্দোলনের প্রতি একাত্মতা ঘোষণা করে বলেন, ‘আপনারা এগিয়ে যান। আমরা সঙ্গে আছি।’প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য প্রসঙ্গে খালেদা জিয়া বলেন, ‘বেড রুমের নিরাপত্তা দিতে পারবেন না। কিন্তু কূটনৈতিক হত্যা হয়েছে রাস্তায়। তার নিরাপত্তা কেন দিতে পারেননি।’তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ খুন-গুম হচ্ছে। পুলিশেরও নিরাপত্তা নেই। কয়েকদিন আগেও পুলিশকে গুলি করা হয়েছে। এসবের সঙ্গে জড়িত আওয়ামী লীগের গুণ্ডবাহিনী।’সরকারের নানা রকম বাধা ডিঙিয়ে মহাসমাবেশে যোগ দেওয়া সকল পর্যায়ের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের ধন্যবাদ জানান খালেদা জিয়া। একই সঙ্গে আগামীর কর্মসূচিতে মাঠে থাকার অনুরোধ জানান তিনি।বিকেল ৪ টা ৪৭ মিনিটে
শুরু করে সন্ধ্যা ৬ টা ৭ মিনিটে ভাষণ শেষ করেন খালেদা জিয়া। মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সাদেক হোসেন খোকার সভাপতিত্বে আরো বক্তৃতা করেন- বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ্, তরিকুল ইসলাম, ব্রিগেডিয়ার (অব.) আ স ম হান্নান শাহ, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা শামসুজ্জামান দুদু, যুগ্ম-মহাসচিব আমানউল্লাহ আমান,
সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক মিলন, যুবদল সভাপতি সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক শিরিন সুলতানা, স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি হাবীব-উন-নবী-খান সোহেল ও ছাত্রদল সভাপতি সুলতান সালাউদ্দিন টুকু।বিএনপি ছাড়াও সম্প্রসারিত নতুন জোটের নেতাদের মধ্যে বক্তৃতা করেন জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমীর মকবুল আহমাদ, নায়েবে আমীর মওলানা আব্দুস সুবহান, ঢাকা মহানগর জামায়াতের নায়েবে আমীর হামিদুর রহমান আযাদ এমপি, ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব মওলানা আব্দুল লতিফ নেজামী, খেলাফত মজলিশের চেয়ারম্যান মওলানা মুহাম্মদ ইসহাক, বিজেপির চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) ড. অলি আহমেদ বীরবিক্রম, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইব্রাহিম, জাগপা সভাপতি শফিউল আলম প্রধান, এনডিপির চেয়ারম্যান খন্দকার গোলাম মোর্ত্তজা, এনপিপি চেয়ারম্যান শেখ শওকত
হোসেন নীলু, বাংলাদেশ ন্যাপের চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গাণি, ইসলামিক পার্টির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আব্দুল মবিন, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মহাসচিব মুফতি মুহাম্মদ ওয়াক্কাস, ন্যাপ ভাসানীর চেয়ারম্যান শেখ আনোয়ারুল হক, বাংলাদেশ মুসলিম লীগের সভাপতি কামরুজ্জামান খান প্রমুখ।দুপুর দেড়টা থেকে শুরু হওয়া এ মহাসমাবেশে সঞ্চালকের ভূমিকা পালন করেন বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী, সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক মিলন, প্রচার সম্পাদক জয়নুল আবদিন ফারুক, অর্থনীতি বিষয়ক সম্পাদক আব্দুস সালাম ও ঢাকা মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি নুরুল ইসলাম বুলবুল।











